বুধবার   ১৯ জুন ২০২৪   আষাঢ় ৬ ১৪৩১   ১২ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৫

  যশোরের আলো
সর্বশেষ:
সেন্টমার্টিনে বিজিবি ও পুলিশকে সতর্ক থাকার নির্দেশ বাংলাদেশকে সুপার এইটে তুললো বোলাররা দলীয় নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় আসুন ত্যাগের মহিমায় দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করি: প্রধানমন্ত্রী চামড়া কেনায় ট্যানারি মালিকরা ২৭০ কোটি টাকা ঋণ পাচ্ছে
৩৬৪

অর্গানিক ড্রাগন চাষে সাড়া ফেলেছেন যশোরের চম্পা

যশোর প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২ আগস্ট ২০২৩  

অর্গানিক ড্রাগন চাষ করে সাড়া ফেলেছেন যশোর সদর উপজেলার উদ্যোক্তা চম্পা বেগম। নানা বাধা উপেক্ষা করে উপজেলার হৈবতপুর ইউনিয়নের বানিয়ালী গ্রামে ২০ শতাংশ জমিতে জৈব পদ্ধতিতে করেছেন ড্রাগন ফলের বাগান। চলতি বছর সেই বাগানে ধরেছে গোলাপি রঙের মিষ্টি ড্রাগন ফল। বর্তমানে তার বাগান দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। সেই সঙ্গে তাকে দেখে ড্রাগন চাষে উদ্বুদ্ধও হয়েছেন অনেকে। 

কঠিন সময়ের মোকাবিলা ২০২২ সালের শুরুর কথা। অসুস্থ স্বামী আর সন্তান নিয়ে বিপর্যস্ত সময় কাটাচ্ছিলেন চম্পা বেগম। বাড়িতে হাঁস-মুরগি আর গরু-ছাগল পালন করে কোনো রকমে দিন পার করছিলেন তিনি। আসলে নিজের মতো করে অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলার চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন তিনি। 

মাস ছয়েক পর জেসিএফর ফিড দ্য ফিউচার বাংলাদেশ নিউট্রিশন অ্যাকটিভিটি প্রকল্পের একটি উঠান বৈঠকে অংশ নেন তিনি। এরপর মনে সাহস নিয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে ১০ শতাংশ জমিতে গড়ে তোলেন অর্গানিক ড্রাগন ফলের বাগান। 
স্বপ্নের বাস্তবায়ন 

কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে চম্পার শুরুটা সহজ ছিল না। কৃষক হিসেবে পুরুষদের দেখে অভ্যস্ত সবাই। নারী হওয়ায় তাকে কৃষি নিয়ে কাজ ভালোভাবে নেয়নি কেউই। কিন্তু সেসব এড়িয়ে নিজের লক্ষ্যে কাজ করে গেছেন তিনি। পরিবার ও এলাকার মানুষের বিরোধিতা সত্ত্বেও ফিড দ্য ফিউচার বাংলাদেশ নিউট্রিশন অ্যাকটিভিটি প্রকল্প ও ডিজিটাল ইনফরমেশনের সহায়তায় প্রশিক্ষণ নেন। এরপর ১০ শতাংশ জমিতে ৫১২টি ড্রাগনের চারা রোপণ করেন তিনি। 

অর্গানিক বাগান তৈরির লক্ষ্যে শুরু থেকেই কোনো রাসায়নিক সারের কাছ ঘেঁষেননি তিনি। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে জৈব পদ্ধতিতে শুরু করেন বাগান পরিচর্যা। মাস ছয়েক পরই ফল আসতে শুরু করে চম্পার বাগানে। বছর শেষে খরচ উঠে লাভের মুখ দেখতে শুরু করেন চম্পা। বর্তমানে ১ বিঘার পরিপূর্ণ অর্গানিক ড্রাগন বাগানের মালিক তিনি। যশোরে সর্বপ্রথম অর্গানিক ড্রাগন বাগানের শুরুও তারই হাত ধরে। 

বাগানের যত্নআত্তি: 
একটি ড্রাগন গাছ পরিপক্ব হতে এক-দুই বছর সময় লাগে। পরিপক্ব একটি গাছে ২৫-৩০টি ড্রাগন ফল ধরে। প্রতি বছর জুন থেকে নভেম্বর এই ৬ মাস ফল পাওয়া যায়। প্রতি কেজি স্বাভাবিক ফলের বর্তমান বাজারমূল্য ২০০-৩০০ টাকা। কিন্তু অর্গানিক ফলের দাম ৩৫০-৪০০ টাকা। চম্পা বেগম আরও জানান, ১ লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে বাগান শুরু করেন তিনি। 

বর্তমানে তার বাগানের ২০ শতাংশ জমিতে গোলাপি রঙের ড্রাগন ফল শোভা পাচ্ছে। ইতিমধ্যে বাগান করার খরচ উঠে গেছে বলে জানান তিনি। বাকি ফল বিক্রি করে ৮-৯ লাখ টাকা আয় হবে বলে আশা করছেন। বাগান ঠিকঠাক পরিচর্যা করলে ৩০ বছর পর্যন্ত ফল পাওয়া সম্ভব বলেও জানান চম্পা। 

চম্পা বেগমের ড্রাগন বাগান দেখে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন অনেকে। বিশেষ করে কৃষিতে নারী উদ্যোক্তা বাড়ানো আন্তরিক চেষ্টা করছেন চম্পা। ‘কৃষক মানেই পুরুষ’ সমাজের প্রচলিত এই দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দিতে দিন-রাত কাজ করে চলেছেন তিনি। চম্পাকে দেখে ড্রাগন চাষে আগ্রহী হয়েছেন বানিয়ালী গ্রামের ফুলিমা বেগম। তিনি বলেন, ‘চম্পা আপা যদি পারে আমি কেন পারব না? আপাকে দেখে আমিও ড্রাগনের চাষ শুরু করিছি। আমি ২০০ চারা রোপণ করেছি। আশা করছি, খুব তাড়াতাড়ি ফল পাব।
 
নিজের কাজ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী চম্পা বেগম। তিনি বলেন, আমি বর্তমানে মানুষকে নিরাপদ ও পুষ্টিকর ড্রাগন ফল খাওয়াতে পারছি। এটাই আমার তৃপ্তি। যখন আমি বাগান করি এলাকার লোক অনেকেই বলেছিল, নারীদের মাঠেঘাটে যাওয়া ঠিক না। কিন্তু আমি সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছি। 

এখন প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন আমার বাগান দেখতে আসে। আমার দেখাদেখি অনেকে এখন এই এলাকায় বাগান করছেন। বিশেষ করে নারীরা। এ জন্য আমি ফিড দ্য ফিউচার বাংলাদেশ নিউট্রিশন অ্যাকটিভিটি প্রকল্পের সবাইকে ধন্যবাদ দিই। 

চম্পার ড্রাগন বাগান নিয়ে আশাবাদী ফিড দ্য ফিউচার বাংলাদেশ নিউট্রিশন অ্যাকটিভিটি প্রকল্পের এরিয়া স্পেশালিস্ট আসাদুজ্জামান সুমন। নিজেদের কাজ নিয়ে তিনি জানান, নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টি নিশ্চিতে যশোর ও খুলনার বিভিন্ন উপজেলায় তাদের নানামুখী কর্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে যশোরে নিরাপদ ফল চাষ নিশ্চিতে ফলচাষিদের বিভিন্ন জৈবপ্রযুক্তি ব্যবহারে সহায়তা করছেন তারা। এর মধ্যে কেঁচো কম্পোস্ট সার, সেক্স ফেরোমন ফাঁদ, মালচিং পদ্ধতি অন্যতম। এগুলো সবই ব্যবহার করা হয়েছে চম্পা বেগমের ড্রাগন বাগানে। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর যশোরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক আবু তালহা বলেন, ‘যশোরের মাটি ড্রাগন চাষের জন্য খুবই উপযোগী। এটি ক্যাকটাস জাতীয় মেক্সিকান একটি ফল। এই ফল বাংলাদেশের আবহাওয়ায় চাষ উপযোগী। 

তবে এটি এখনও শৌখিন ফসল, তাই দেশে এখনও বাণিজ্যিকভাবে ততটা সহজ হয়নি এর চাষ। তিনি আরও বলেন, আমাদের উপ-পরিচালক চম্পা বেগমের বাগান পরিদর্শন করেছেন। উনি নারী উদ্যোক্তা হিসেবে এ অঞ্চলে গোলাপি রঙের মিষ্টি ড্রাগন চাষ করে বিপ্লব ঘটিয়েছেন বলে আমরা বিশ্বাস করি। চম্পা বেগমের কোনো সহযোগিতার দরকার হলে যশোরের কৃষি বিভাগ অবশ্যই তার পাশে থাকবে। 

  যশোরের আলো
  যশোরের আলো
এই বিভাগের আরো খবর