শনিবার   ০৪ জুলাই ২০২০   আষাঢ় ১৯ ১৪২৭   ১৩ জ্বিলকদ ১৪৪১

  যশোরের আলো
৫৩৮

কিস্তিতে ক্রয়-বিক্রয়ের শরীয়ত সম্মত পদ্ধতি

নিউজ ডেস্ক:

প্রকাশিত: ২৩ মার্চ ২০১৯  

কিস্তিতে ক্রয়-বিক্রয় বর্তমানে বহুল প্রচলিত একটি পদ্ধতি। ফ্লাট, প্লট, গাড়ি ইত্যাদি থেকে নিয়ে সব ধরনের জিনিস এখন কিস্তিতে বিক্রি হচ্ছে। 

অনেক সমিতি কিস্তিতে বিক্রির পদ্ধতিকে অবলম্বন করে পুঁজি বিনিয়োগ করছে। বিশেষভাবে যারা ইসলাম সম্মত পদ্ধতিতে পুঁজি বিনিয়োগ করতে চান তারা এ পদ্ধতির দিকে বেশি ঝুঁকছে। তাই কিস্তিতে ক্রয়-বিক্রয়ের বিভিন্ন বিধিবিধান পাঠকদের সামনে তুলে ধরা হলো।

কিস্তিতে ক্রয়-বিক্রয়ের অর্থ:

কিস্তিতে বিক্রয় বলতে বুঝানো হয়, বিক্রেতা ক্রেতাকে পণ্য নগদ দিয়ে দিবে আর ক্রেতা মূল্য নগদ পরিশোধ করবে না বরং নির্ধারিত কিস্তিতে পরিশোধ করবে। অতএব, উক্ত পদ্ধতিতে ক্রয়-বিক্রয় হলেই তাকে কিস্তিতে বিক্রয় বলবে; চাই পণ্যের মূল্য বাজার দরে হোক, তার চেয়ে বেশি বা কম। কিন্তু কিস্তিতে বিক্রয়ের ক্ষেত্রে সাধারণত পণ্যের মূল্য বাজার দরের চেয়ে একটু বেশিই হয়ে থাকে। এ জন্য দেখা যায়, ক্রেতা নগদে কমে কিনতে পারবে, কিন্তু বাকিতে হলে বিক্রেতা রাজি হয় না, যাবত না তাকে বাজার মূল্যের চেয়ে কিছু দেয়া না হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বিলম্বে মূল্য পরিশোধের কারণে দাম বৃদ্ধি করা জায়েজ হবে?

মূল্য পরিশোধে বিলম্বের কারণে মূল্য বৃদ্ধি করা জায়েজ?
বিলম্বে মূল্য পরিশোধের কারণে দাম বৃদ্ধি করা জায়েজ হবে কী না, এ ব্যাপারে সমকালিন ও আগেকার যুগের ফকিহগণ কোরআন হাদিসের আলোকে নিজেদের মতামত দিয়েছেন। এ ব্যাপারে দুটি মত পাওয়া যায়-

(ক) কোনো কোনো ফকিহ মূল্য পরিশোধে বিলম্বের কারণে মূল্য বৃদ্ধিকে নাজায়েজ বলেছেন। কারণ হচ্ছে, অতিরিক্ত মূল্য সময়ের মোকাবেলায় নেয়া হয়। আর সময়ের বিনিময়ে অতিরিক্ত মূল্য নেয়া সরাসরি সুদের অন্তর্ভূক্ত বা সুদের সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে এমন। জয়নুল আবিদিন আলী ইবনে হুসাইন (রাহ.), নাসের ও মুসাওবির বিল্লাহ (রাহ.) প্রমুখ এই মত পেশ করেছেন।

(খ) বাকি সকল ফকিহগণের মত হচ্ছে, নগদে বিক্রির চেয়ে বাকি বিক্রির মূল বেশি ধরতে কোনো সমস্যা নেই। তবে শর্ত হচ্ছে, বৈঠকেই নিশ্চিত করতে হবে সে নগদ মূল্যে পণ্য ক্রয় করেছে নাকি বাকি মূল্যে। এ কারণে, বিক্রেতা যদি বলে নগদে নিলে এত টাকা আর বাকিতে নিলে এত অতপর কোনো একটাকে নিশ্চিত না করে বৈঠক শেষ করে দেয় তাহলে উক্ত ক্রয়-বিক্রয় সহিহ হবে না। এর দলীল হচ্ছে, কোরআন হাদিসের কোথাও নেই যে, এ রকম লেনদেন নাজায়েজ। এখানে অতিরিক্ত মূল্য যা নেয়া হচ্ছে, তা সুদের সংজ্ঞায় পড়ে না। কারণ, এখানে তো ঋণ দিয়ে বেশি নেয়া হচ্ছে না এবং শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত সুদি মালের লেনদেনও হচ্ছে না; যেখানে কমবেশি করা না জায়েজ। বরং এটা একটা সাধারণ ক্রয়-বিক্রয়। সাধারণ লেনদেনে চূক্তিকারীর স্বাধীনতা থাকে, যেকোনো মূল্যে সে পণ্য বিক্রি করতে পারবে। তার জন্য বাজার দরেই পণ্য বিক্রি করা জরুরি নয়। 

প্রত্যেকে ব্যবসার ধরণ অনুযায়ী পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে। ব্যবসার ধরণের ভিন্নতার কারণে একই পণ্যের মূল্য কমবেশি হতে পারে। যেমন পণ্য এক, কিন্তু পাইকারি ও খুচরা মূল্য ভিন্ন ভিন্ন। এ সকল ক্ষেত্রে শরীয়ত নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি বাতলে দেয়নি। এ জন্য কোনো ব্যক্তি যদি একই পণ্য একজনের কাছে পাঁচ টাকায় আরেকজনের কাছে দশ টাকায় বিক্রি করে তাহলে তা বৈধ হবে। তদ্রুপ নগদে পাঁচ টাকায় আর বাকিতে দশ টাকায় বিক্রি করলে, তাও সর্বসম্মতি ক্রমে জায়েজ। তবে শর্ত হচ্ছে, কোনো ধোঁকা, প্রতারণার আশ্রয় নেয়া যাবে না।
 
বাকিতে বিক্রি নাজায়েজ একটি পদ্ধতি:
বিক্রি বাকিতে হলে মূল্য বেশি ধরা জায়েজ যা পূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে তা ওই সুরতে যখন পণ্যের বাকি মূল মূল্যই বেশি ধরা হবে। কিন্তু সুরত যদি এ রকম হয় যে, প্রথমে নগদ বিক্রির ভিত্তিতে একটা স্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ করে। তারপর ওই মূল্য আদায়ের মেয়াদ কমবেশি হওয়ার ভিত্তিতে তার থেকে টাকা কমবেশি নেয়া হয় তাহলে এটা সুদের অন্তর্ভূক্ত হবে। যেমন বিক্রেতা বললো, এই পণ্যটি নগদ আট টাকায় তোমার কাছে বিক্রি করেছি। এখন এই আট টাকা আদায়ে যদি একমাস বিলম্ব হয় তাহলে তার সঙ্গে আরো দুই টাকা অতিরিক্ত দিতে হবে। আরো বেশি বিলম্ব হলে আরো বেশি দিতে হবে। সুদ হওয়ার কারণ হচ্ছে, আট টাকায় ওই লোকের কাছে পণ্য বিক্রি চূড়ান্ত হওয়ার পর ওই টাকাটা ক্রেতার জিম্মায় ঋণ হিসেবে রয়েছে। আর ঋণের চেয়ে বেশি চাওয়াই হচ্ছে সুদ।

বাকিতে বেশি মূল্যে বিক্রি আর এই সুরতের মাঝে পার্থক্য হচ্ছে, বাকিতে বেশি মূল্যে বিক্রি করার সুরতে পরবর্তীতে টাকা কমবেশি হওয়ার সম্ভবানা নেই। যেমন চার মাসের মেয়াদে বিক্রি হয়েছে। এখন যদি মূল্য পরিশোধ করতে আরো দুই মাস বিলম্ব হয় তারপরও ক্রেতার কাছ থেকে অতিরিক্ত কোনো টাকা নেয়া যাবে না। আর দ্বিতীয় সুরতে যতই বিলম্ব হবে ততই টাকা বৃদ্ধি পেতে থাকবে। 

মূল্য পরিশোধের নিশ্চয়তার জন্য কোন কিছু জামানত রাখা:
বাকিতে বিক্রি করলে পণ্য ক্রেতাকে নগদ দিয়ে দেয়া হয়। সে আস্তে আস্তে মূল্য পরিশোধ করে তাই। তাই এখন প্রশ্ন হচ্ছে মূল্য পরিশোধের নিশ্চয়তার জন্য ক্রেতার কোনো বস্তুকে জামানত হিসেবে রাখা যায় কী না। মূল্য পরিশোধের নিশ্চয়তার জন্য ক্রেতার কোনো বস্তুকে জামানত হিসেবে রাখার ব্যাপারে ফকিহগণের মাঝে কেউ দ্বিমত পোষণ করেননি। সর্বসম্মতিক্রমে এটা জায়েজ।

জামানত রাখার পদ্ধতি:
বাকি মূল্য আদায়ের নিশ্চয়তার জন্য জামানত রাখার দুটি পদ্ধতি আছে। (ক) ক্রেতার কোনো বস্তু বিক্রেতার নিকট বন্ধক রাখা। এটাকে শরয়ি পরিভাষায় ‘রেহান’ বলা হয়। পাওনাদার কোনো অবস্থাতেই বন্ধকি বস্তু দ্বারা উপকৃত হতে পারবে না। কারণ, বন্ধকি বস্তু দ্বারা উপকৃত হওয়াকে ফকিহগণ সুদের অন্তর্ভূক্ত গণ্য করেছেন। বন্ধক রাখার হেকমত হচ্ছে, ক্রেতা বন্ধক রাখার কারণে নির্ধারিত সময়ে মূল্য পরিশোধের চাপে থাকবে। আর নির্ধারিত সময়ে মূল্য পরিশোধের ব্যাপারে যদি গড়িমসি করে তাহলে বিক্রেতা বন্ধকি বস্তু বিক্রি করে নিজের পাওনা আদায় করতে পারবে। এক্ষেত্রে নিজের পাওনার চেয়ে বেশি নিতে পারবে না। যেমন পাওনা হচ্ছে পাঁচ হাজার টাকা। বন্ধকি বস্তুর মূল্য সাত হাজার টাকা। তাহলে বিক্রি করে নিজের পাওনা আদায় করে বাকি দুই হাজার টাকা ক্রেতাকে দিয়ে দিতে হবে। পুরো টাকা রাখা যাবে না।

পণ্যের কাগজপত্র জামানত হিসেবে রেখে দেয়া:  
ক্রেতা নিজের মালিকানাধীন কোনো বস্তুকে জামানত হিসেবে রাখতে পারে যেমনটা পূর্বে আলোচনা হয়েছে। তেমনিভাবে ক্রয়কৃত বস্তুর কাগজপত্রও জামানত হিসেবে রাখতে পারবে। ফকিহগণ এটাকে জায়েজ বলেছেন।

বন্ধকি বস্তু ঋণী ব্যক্তির কাছেই রেখে দেয়া জায়েজ?
বন্ধকি বস্তুর ক্ষেত্রে মূল হচ্ছে, ওই বস্তু পাওনাদারের কাছে রাখা। কিন্তু বর্তমানে কোনো কোনো ইসলামি রাষ্ট্রের নিয়ম হচ্ছে, ওই বস্তু পাওনাদারের কবজায় না দিয়ে মালিকের কাছেই রেখে দেয়া। তবে ঋণী ব্যক্তি কখনো পাওনা আদায় করতে অক্ষম হলে পাওনাদারের এই অধিকার থাকে যে, সে বন্ধকি বস্তু বিক্রি করে নিজের পাওনা আদায় করবে। যেমন ঋণী ব্যক্তি নিজের গাড়ি পাওনাদারের কাছে বন্ধক রেখেছে। কিন্তু ওই গাড়ি পাওনাদারের কাছে না দিয়ে, নিজের কবজায় রেখে দিয়েছে এবং প্রয়োজনে ব্যবহার করছে। তবে পাওনাদারের পাওনা আদায়ের আগে, মালিক ওই গাড়ি কারো কাছে বিক্রি করতে পারবে না। আবার কখনো যদি ঋণী ব্যক্তি পাওনা পরিশোধে অক্ষম হয়ে পড়ে তাহলে পাওনাদার গাড়ি বিক্রি করে নিজের টাকা আদায় করে নিতে পারবে। প্রশ্ন হচ্ছে, পাওনা আদায়ের নিশ্চয়তার জন্য এভাবে বন্ধক রাখা জায়েজ হবে কিনা।

কারো কারো মতে এ ধরনের বন্ধকি পদ্ধতি জায়েজ নেই। কারণ, ফিকহের আলোকে প্রমাণিত যে, বন্ধক সহিহ হওয়ার জন্য শর্ত হচ্ছে, বন্ধকি বস্তু পাওনাদারের কবজায় দিয়ে দিতে হয়। এখানে এটা ঋণী ব্যক্তির কবজায় থেকে যায়; পাওনাদারের নয়। কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছে, কিছু কারণে এ ধরনের বন্ধক রাখা যেতে পারে। কারণগুলো নিম্নে তুলে ধরছি, যেন সমকালিন ফকিহগণ এগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্তে আসতে পারেন।

এক. উল্লিখিত পদ্ধতিতে যদিও বন্ধকি বস্তু কবজ করা হয় না, কিন্তু সাধারণত এর কাগজপত্র কবজ করা হয়। এ জন্য, এ কথা বলার সুযোগ তৈরি হয়েছে যে, বস্তুর দলিলপত্র কবজ করার দ্বারাই বন্ধকি চূক্তি সম্পন্ন হয়েছে। তারপর ঋণী ব্যক্তি আরিয়ত নিয়ে এর দ্বারা উপকৃত হচ্ছে। আরিয়ত বলা হয়, কাউকে কোনো বস্তু দ্বারা উপকৃত হওয়ার সুযোগ দেয়া।

দুই. বন্ধকি বস্তু কবজ করার যে উদ্দেশ্য এখানে সে উদ্দেশ্যও পূরণ হয়। যেমন বন্ধক রাখার উদ্দেশ্য হচ্ছে, পাওনাদার যেন প্রয়োজন মুহূর্তে বন্ধকি বস্তু বিক্রি করে নিজের ঋণ আদায় করতে পারে। বস্তুর কাগজপত্র পাওনাদারের কবজায় থাকার কারণে এখানে এটাও সম্ভব।

তিন. বন্ধকের একটি উদ্দেশ্য হচ্ছে, ঋণকে মজবুত করা। এই উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য শরীয়ত পাওনাদারকে অধিকার দিয়েছে যে, ঋণী ব্যক্তির কোনো বস্তু নিজের কবজায় নিয়ে আসবে এবং ঋণ পরিশোধের আগ পর্যন্ত এতে ঋণী ব্যক্তিকে কোনোরূপ হস্তক্ষেপের সুযোগ দেবে না। এখন যদি পাওনাদার এর চেয়ে কমে রাজি থাকে। যেমন তাকে শুধু এই অধিকার দেয়া হলো যে, প্রয়োজন মুহূর্তে সে এটাকে বিক্রি করতে পারবে। আর বাকি সময় ঋণী ব্যক্তির কবজায় থাকবে। এটা নাজায়েজের বাহ্যিক কোনো কারণ আমার দৃষ্টিতে আসছে না। এ রকম আরো কিছু কারণে, এই পদ্ধতিতে বন্ধক রাখা আমার কাছে জায়েজই মনে হয়। 

  যশোরের আলো
  যশোরের আলো