সোমবার   ২২ জুলাই ২০২৪   শ্রাবণ ৬ ১৪৩১   ১৫ মুহররম ১৪৪৬

  যশোরের আলো
৪২

মৃতরা কি আমাদের কথা শুনতে পায়?

প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৩  

যদি আজান শুনতে পান, পদধ্বনি শুনতে পান, তাহলে কি কবির কবরে গিয়ে তাকে একটা কবিতাও শোনানো যাবে? কিংবা তার কবরে গিয়ে তার নাম ও সত্তার প্রতি যে জুলুম করা হয়েছে তা শোনানো যাবে? 

যদিও কখনো কেউ কবির কবরের পাশে গিয়ে এসব করার চিন্তা-ভাবনা করেনি, করবেও না। কিন্তু সমাজের অনেক মানুষকে আমরা দেখি, তারা বিভিন্ন ওলি-আউলিয়ার কবরে গিয়ে তাদের কাছে সন্তান চায়, সম্পদ চায়, চাকুরি চায়।

হ্যাঁ, তাদের কবর জিয়ারত করা, কবরের পাশে গিয়ে সুরা ফাতিহা ও সুরা ইখলাস পাঠ করা এবং তাদের নেক আমল-মাকবুলিয়াতকে উসিলা করে, মাধ্যম বানিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করা যায়। 

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আকিদা হলো, নবী-ওলীদের নেক আমল-কবুলিয়াতকে মাধ্যম বানিয়ে, উসিলা করে দোয়া করা বৈধ। 

কিন্তু দ্বীনের অজ্ঞতা ও ভণ্ড পীরদের অসততার ফলে এ উসিলা বর্তমানে শিরকে রূপান্তরিত হয়েছে। সবাই পীরের নামে, মাজারের নামে বিভিন্ন বস্তু উৎসর্গ করে, মান্নত করে, জবাইও করে। আমরা এসব কর্মকে সরাসরি শিরক বলে বিশ্বাস করি।

আর তাই, মৃতরা শুনতে পায় কিনা- এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ প্রশ্নের উত্তর আমরা প্রথমত কুরআন মাজিদে খুঁজবো। এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস, সাহাবায়ে কেরামের বক্তব্য ও পরবর্তী আহলে ইলমের মতামত নিয়ে আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ। 

কুরআন মাজিদের দৃষ্টিতে মৃতদের শ্রবন

কাফিররা জীবিত হলেও মৃত সাদৃশ

মানুষ মারা যাওয়ার পর জীবিত মানুষের মতো সবকিছু শুনতে পায় কিনা— আহলে ইলমদের মত হলো, এ নিয়ে আল্লাহ তা‘আলা কুরআন মাজীদের কোথাও সরাসরি আলোচনা করেননি।

আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কার কুরাইশদের ইসলামের দাওয়াত দেন, তারা অবজ্ঞাসূচক আচরণ করে এবং নবীজীর আহ্বান শুনেও না শোনার ভান করে এড়িয়ে যায়। তাদের এ আচরণ সত্ত্বেও আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাওয়াত বন্ধ করেননি। 

তিনি দিনে দাওয়াত দিতেন, রাতে দাওয়াত দিতেন। ঘরে ঘরে গিয়ে দাওয়াত দিতেন, বাজারে ঘুরে ঘুরে দাওয়াত দিতেন। অথচ মুশরিকদের আচরণে মোটেও পরিবর্তন ঘটেনি। 

কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা তাদের এ আচরণ পছন্দ করেননি। তাই তিনি কুরআন মাজিদে তাদের এ আচরণ সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন। তিনি তাদের এ আচরণকে মৃত মানুষ আর কবরে দাফনকৃত মানুষের সাথে তুলনা করে দুটো আয়াত অবতীর্ণ করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহর চেয়ে শ্রেষ্ঠ উপমা প্রদানকারী আর কেউ নেই।

প্রথম আয়াত : ‘নিশ্চয় আপনি মৃতদের শোনাতে পারবেন না, আর বধিরদেরকেও দাওয়াত শোনাতে পারবেন না, যখন তারা পিঠ ঘুরিয়ে চলে যায়।’ [সূরা আন-নামল- ২৭:৮০]

দ্বিতীয় আয়াত: ‘আর জীবিতরা ও মৃতরা এক নয়। নিশ্চয়ই আল্লাহ যাকে ইচ্ছা শোনাতে পারেন। কিন্তু যে ব্যক্তি কবরে আছে, তাকেও আপনি শোনাতে পারবেন না।’ [সূরা আল-ফাতির- ৩৫:২২]

উপরোক্ত দু’ আয়াতের বক্তব্য স্পষ্ট। 

প্রথম আয়াতের বক্তব্য হলো, যে মৃত কিংবা যে বধির, সে শুনবে না। 

দ্বিতীয় আয়াতের বক্তব্য হলো, আল্লাহ যাকে শোনার ক্ষমতা দেন, সে কেবল শুনতে পায়। কিন্তু যে কবরে দাফন রয়েছে, সে সাধারণভাবে শুনতে পায় না।

শহীদদের মৃত্যু হলেও তারা জীবিত

মানুষের পাপের কারণে পৃথিবীতে বিপর্যয় আসে, তখন মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে, ধৈর্যহারা হয়ে যায়। কিন্তু যারা আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখে, তারা আল্লাহর নিকট ধৈর্য এবং সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন। 

যারা আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যুদ্ধের বিভীষিকার সময়ও দৃঢ়তার সাথে অটল-অবিচল থাকে, একসময় তারা শাহাদাতের সুধা পান করে। তারাই শ্রেষ্ঠ ধৈর্যধারণকারী। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হন। পুরস্কার স্বরুপ তিনি তাদের মৃত্যু পরবর্তী জীবন দান করেন। তারা মৃত হয়েও যেন জীবিত!

এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা কুরআন মাজীদে দু’টি আয়াত অবতীর্ণ করেছেন। 

প্রথম আয়াত: “আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, তাদের মৃত বলো না; বরং তারা জীবিত। কিন্তু তোমরা তা বুঝো না।” (সুরা বাকারা : ১৫৪)

দ্বিতীয় আয়াত:“আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, তাদেরকে মৃত মনে করো না; বরং তারা জীবিত, নিজেদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে রিযিকপ্রাপ্ত।” (সুরা আলে-ইমরান : ১৬৯)

এ দু-আয়াতের সংক্ষিপ্ত কথা হলো: যারা শহীদ হয়, তারা আসলে মৃত নয়। যদিও তারা দুনিয়ার হিসেবে মৃত। তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে রিজিকপ্রাপ্ত।

হাদিসের দৃষ্টিতে মৃতদের শ্রবণ

প্রথম হাদিস: ইসলামের প্রথম গাযওয়া বদর প্রান্তরে সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী আল্লাহর অনুগ্রহে বিজয়ী হয়। যুদ্ধের পরও তিনদিন মুসলিম বাহিনী সেখানে অবস্থান করে। এ যুদ্ধে ৭০ জন কাফির নিহত হয়। এদের ২৪ জনকে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদরের এক পরিত্যক্ত কূপে নিক্ষেপ করতে বলেন। 

তৃতীয় দিন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে কূপ পরিদর্শনে যান। সেখানে গিয়ে কূপে নিক্ষিপ্ত নিহত কাফিরদের নাম ও বাবার নাম উল্লেখ করে ডাকেন। 

এরপর তাদের সম্বোধন করে কুরআন মাজীদের একটি আয়াত তিলাওয়াত করেন:‘ আমাদের প্রতিপালক আমাদের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আমরা তো তা সত্য পেয়েছি। তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের যে ওয়াদা দিয়েছিলেন, তোমরাও কি তা সত্য পেয়েছ?’ (সূরা আরাফ : ৪৪)

এ দৃশ্য দেখে উমর (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি এমন ব্যক্তিদের সম্বোধন করে কথা বলছেন, যাদের রূহ নেই? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তার শপথ, যার হাতে মুহাম্মদের জীবন, আমি যা বলছি, তা তোমাদের চেয়েও তারা ভালো শুনতে পাচ্ছে। 

দ্বিতীয় হাদিস: একদিন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের মৃত্যুর পরবর্তী অবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন। 

এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘মানুষকে যখন কবরে রাখা হয়। আর তাকে কবরে রেখে তার সাথীরা চলে যায়, (এতটুকু দূরে যে,) তখনও সে তাদের জুতার শব্দ শুনতে পায়, এমন সময় তার নিকট দু’জন ফিরিশতা আগমন করেন’। 

তৃতীয় হাদিস: একদিন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কিরামকে কবর জিয়ারত করার পদ্ধতি হিসেবে একটি দোয়া শিখিয়েছেন। 

দোয়াটি হলো: ‘হে কবরের অধিবাসীরা! তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক, আল্লাহ তায়ালা আমাদের ও তোমাদেরকে ক্ষমা করুন। তোমরা আমাদের অগ্রগামী, আমরা তোমাদের উত্তরসূরি

চতুর্থ হাদিস: ইবনে আবদুল বার রাহি. (মৃত্যু : ৪৬৩ হি.) বর্ণনা করেছেন: ‘যখন কেউ তার মুমিন ভাইয়ের কবরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় সালাম দেয়, দুনিয়াতে উভয়ের মাঝে পরিচিতি থাকলে, সালাম শুনে কবরস্থ ব্যক্তি তাকে চিনতে পারে এবং সে সালামের উত্তর প্রদান করে। 

মুহাদ্দিস আবদুল হক ইশবিলি রাহি. (মৃত্যু : ৫৮১ হি.) এ হাদিসকে সহিহ বলেছেন। 

লক্ষণীয় বিষয় 

শায়খুল হাদিস মাওলানা সলিমুল্লাহ খান (রাহি.) বলেন: এ মাসআলা ইজতিহাদী মাসআলা। এ মাসআলায় সাহাবায়ে কিরামগণও বিভিন্ন মত রাখতেন। তাই যারা বলেন, মৃতরা শ্রবণ করে কিংবা যারা বলেন, মৃতরা শ্রবণ করে না- এ দু-পক্ষের কাউকে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআত থেকে খারিজ করে দেওয়া বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জন।

হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভীকে (রাহি.) যখন এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। 

তিনি উত্তরে বলেন, এ মাসআলার সাথে আকিদার সম্পর্ক নেই। পাশাপাশি এর উপর শরীয়তের কোনো ইলমী আলোচনা ও আমল নির্ভর করে না। তাই এ বিষয়টি কোনো একদিকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আবশ্যকীয়তাও রাখে না।

তবুও আমরা কেন আলোচনা করছি? কারণ, মানুষ জানতে চায়, মৃতরা শুনতে পায় কিনা? এ বিষয়ের সাথে বর্তমানে মানুষের অনেক কর্ম জড়িত, যেসব কর্ম সরাসরি আকিদা ও ফিকহের সাথে সম্পর্কিত।

সাধারণ মানুষ হয়তো কবি নজরুল ইসলামের কবরে গিয়ে তাকে একটা কবিতা শুনিয়ে আসে না, কিন্তু ওলি-আউলিয়াদের কবরে গিয়ে সন্তান চাওয়া, সম্পদ চাওয়া ও বিপদমুক্তি চাওয়ার কাজ সচরাচর করে থাকে।

শায়খ আলবানী (রাহি.) বলেছেন, মৃতরা শুনতে পায় – এ বিশ্বাসের কারণে মানুষজন বর্তমানে অনেক শিরকি কাজে লিপ্ত হচ্ছে। উদাহরণত: ওলি-আউলিয়াদের নিকট প্রার্থনা করা। আল্লাহ ব্যতীত তাঁদের নাম জপা। মূর্খতা আর গোঁড়ামির  কারণে সাধারণ মানুষ এ চিন্তা-বিশ্বাস থেকে সরে আসতে চায় না।

সাহাবায়ে কিরাম ও ইমামদের দৃষ্টিকোণ

আকিদা সংক্রান্ত গুটিকয়েক বিষয় নিয়েই সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.) এর মাঝে মতবিরোধ হয়েছিল। এরমাঝে ‘মৃতব্যক্তির শ্রবণ করা, না করা’ অন্যতম। 

এ বিষয়ে সাহাবিদের মাঝে দুটি মতভেদ হলেও পরবর্তী আলেমদের মাঝে এখানে আরো একটি মত তৈরি হয়। 

সাহাবিদের মাঝে, মৃতরা শুনতে পায় না–বলে মনে করতেন আম্মাজান আয়েশা (রাযি.)। বিপরীতে মৃতরা শুনতে পায় বলে মনে করেন একাধিক সাহাবায়ে কিরাম। 

তারা হলেন :
●উমর বিন খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) 
●আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) 
●আনাস ইবনে মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) 
●আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) 
●ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)

সাহাবায়ে কিরামের এ মতবিরোধ পরবর্তীতে তিনভাবে বিভক্ত হয়। 

প্রথম দল বলেন: মৃতরা সাধারণ জীবিত মানুষের মতোই সবকিছু শুনতে পায়।

ইমাম মুহাম্মাদ আমিন শিনকীতী (রাহি.) (১৩৩৯ হি.) বলেন: ‘দলীল প্রমাণের আলোকে যে মতটি অগ্রাধিকার পাওয়ার সেটি হলো, মৃতদের সাথে কথা বললে মৃতরা শোনে। 

এছাড়াও সাধারণভাবে এমন শোনার মত প্রদান করেন মুহাম্মাদ বিন মুফলিহ (মৃ. ৭৬৩ হি.) ও হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি (রাহি.) (মৃ. ৮৫২ হি.) তবে, ইবনে হাজার মৃত ব্যক্তির রূহের শ্রবণের কথা বলেন।
 
দ্বিতীয় দল বলেন: তারা কোনো কোনো অবস্থায়ে শোনে, কোনো কোনো সময়ে শোনে না। কখনো শোনে, কখনো শোনে না।

এ দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলেন: 
ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে জারির তাবারী রাহি. (মৃ. ৩১০ হি.)[
ইমাম ইবনে তাইমিয়া রাহি. (মৃ. ৭২৮ হি.)
ইমাম ইবনুল কায়্যিম রাহি. ( মৃ. ৭৫১ হি.) 

ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রাহি.) বলেন: ‘কুরআন ও হাদিসের এসকল প্রমাণের আলোকে স্পষ্ট, মৃতরা জীবিত ব্যক্তির কথা শুনতে পায়। কিন্তু তারা সবসময় শুনতে পাবে, এমনটা আবশ্যকীয় নয়। তারা কখনো শুনতে পায়, কখনো শুনতে পায় না। যেমন জীবিত ব্যক্তিরও হয়। তার সাথে কথা বললে উপস্থিত থেকেও কখনো শুনতে পায়, অনেক সময় সে তা শুনতে পায় না। আবার তাদেরকে যাই বলা হোক, তারা সব শুনতেও পায় না। মূলত এই শ্রবণটা সাধারণ শ্রবণ নয়। বরং শ্রবণের উপলব্ধি। আর এজন্য তাদেরকে বললেও তারা কিছু করতে পারে না। ... এজন্য যদিও তারা কথা শুনে, বুঝতে পারে কিন্তু উত্তর দিতে পারে না। আর তাই তাদেরকে আদেশ-নিষেধ, আবেদন-নিবেদন করেও লাভ নেই।

তৃতীয় দল বলেন: মৃতরা শুনতেই পায় না। হ্যা, হাদিসে বর্ণিত বিশেষ অবস্থা ব্যতীত।

এ দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলেন : 
●কাতাদাহ বিন দিআমাহ রাহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু : ১১৮ হি.)
●মুহাম্মাদ বিন শাআলি আল-মাযারি রাহি. 
●কাযি আবু ইয়ালা রাহি. (মৃ. ৪৫৮ হি.) 
●ইবনুল আতিয়্যা আল-আন্দালুসি রাহি. (মৃ. ৫৪১ হি.)
●নু’মান বিন আলুসি রাহি. (মৃ. ১৩১৭ হি.)

কাতাদাহ বিন দিআমাহ রাহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু : ১১৮ হি.) বলেন: (বদর প্রান্তরে) আল্লাহ তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা শোনাতে, তাদের ধমকি, লাঞ্ছনা, দুঃখ-কষ্ট, আফসোস এবং লজ্জা দেওয়ার জন্য (সাময়িকভাবে) দেহে প্রাণ সঞ্চার করেছিলেন।

হানাফি ও দেওবন্দিদের মাঝে কি মতপার্থক্য রয়েছে? 

অনেকে বলেন, হানাফি মাজহাবের প্রসিদ্ধ মতামত হলো, মৃতরা শুনতে পায় না। 

এ বিষয়ে নুমান বিন আলুসি রাহি. একটি রিসালা লিখেছেন: الآيات البينات في عدم سماع الأموات عند الحنفية السادات  নামে। যা শায়খ আলবানি (রাহি.) তাহকিক করেছেন।

নুমান বিন আলুসি রাহি. পিতা বিখ্যাত মুফাসিসর শিহাবুদ্দীন মাহমুদ আলুসি (রাহি.) (মৃ. ১২৭০ হি.) বলেন : ‘সত্য হলো, মূলগতভাবে মৃতরা শুনতে পায়। …. তবে, তাদের শ্রবণটা হাদিসে বর্ণিত বিষয়ের সাথে সংক্ষিপ্ত করা, যেমন মৃতদের সালাম প্রদান করলে তারা শ্রবণ করে।’

এ বিষয়কে সামনে রেখে আমেরিকান স্কলার ড. ইয়াসির কাদি তার এক লেকচারে দাবি করেছেন, হানাফি মাজহাবের প্রসিদ্ধ মতামত আর দেওবন্দি ধারার মতামতের মাঝে পার্থক্য রয়েছে। 

এছাড়াও এ বিষয়ে মানুষের মাঝে ভ্রান্তি রয়েছে। তারা দেওবন্দি ধারার আলেমদেরকে এ বিষয়ে হানাফি মাজহাবের মূলধারার বিরোধী মনে করেন। কিন্তু দেওবন্দি আলেমদের কিতাবাদি মুতালা করলে আমরা এর  ভিন্ন চিত্র দেখতে পাই। 

ইমাম আনওয়ার শাহ কাশমিরি (রাহি.০ (মৃ. ১৩৫২ হি) বলেন: মৃতদের কথা বলা ও শ্রবণ করার বিষয় একই। এ বিষয়টি বর্তমানের অনেক হানাফি আলেম অস্বীকার করেন। কিন্তু মোল্লা আলি কারি (রাহি.) (মৃ. ১০১৪ হি.) এর এ বিষয়ে হাতে লেখা, অপ্রকাশিত একটি রিসালা রয়েছে। তিনি সেখানে বলেন, ‘আমাদের ইমামগণের কেউ মৃতদের শ্রবণের বিষয়টি অস্বীকার করেননি। … কিন্তু তারা (ইবনুল হুমাম রাহি. ও অন্যান্যগণ) যা বলেন, সে বিষয়ের সুস্পষ্ট কোনো প্রমাণ নেই।’

‘আর ইবনুল হুমাম (রাহি.) (মৃ. ৮৬১ হি.) প্রথমত মৃতদের শ্রবণকে অস্বীকার করেন, এরপর হাদিসে বর্ণিত অবস্থাগুলোর আবার স্বীকৃতি দেন।’ 

ইমাম কাশমিরি বলেন, এর প্রয়োজনীয়তাটা কী? প্রথমত অস্বীকার করা, এরপর আবার নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে স্বীকৃতি দেওয়া? উভয়ের মাঝে তফাৎটা কী? আমরা মৃতদের শোনার বিষয়টা স্বীকার করি, পাশাপাশি এটাও তো বলি, যে, আমরা তাদের শোনার পদ্ধতি সম্পর্কে জানি না। জীবিতরাও তো সবসময় সবকিছু শুনে না। মৃতদের ক্ষেত্রে এ চিন্তা আসবে কীভাবে? এজন্য আমরা মূলগতভাবে মৃতদের শ্রবণের কথা বলি।’

এ বিষয়ে মুফতিয়ে আযম পাকিস্তান মুফতি মুহাম্মাদ শফি স্বতন্ত্র একটি রিসালা লিখেছেন। যার নাম : আত-তাকমিলুল হুবুর বি সিমায়ি আহলিল কুবুর

এছাড়াও তিনি তার বিখ্যাত তাফসির কিতাব, মারেফুল কুরআন-এ লিখেন: সুরা নামল, সুরা রুম ও সুরা ফাতিরের আয়াতের মাধ্যমে এটাও প্রমাণিত হয়, যে, মৃতদের শোনানো আমাদের ইচ্ছাধীন নয়। বরং আল্লাহ যাকে চান শোনান। এজন্য মৃতদের শোনার বিষয়ে সহিহ হাদিসে যে সকল অবস্থার কথা বর্ণিত হয়েছে, এ সকল অবস্থায় মৃতদের শোনার বিষয়ে বিশ্বাস রাখতে হবে। আর হাদিসে বর্ণনার বাহিরে  যে সকল অবস্থা রয়েছে, সে সকল ক্ষেত্রে শোনা ও না শোনার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, এ বিষয়গুলো পরিপূর্ণভাবে প্রমাণিত নয়, আবার নিষেধও নয়। আল্লাহু আ’লাম।

এ বিষয়ে শেষ কথা

মাওলানা কাসিম নানুতাবি (রাহি.) (মৃ. ১২৯৭ হি.) বলেন: এ বিষয়ের সমাধান তো মৃত্যুর পরই সম্ভব। যদি মৃত্যুর পর আমরা অন্যের সালাম-কালাম শুনতে পাই, তাহলে তো ‘মৃতরা শুনতে পায়’-এটা প্রমাণিত হলো। আর যদি শুনতে না পাই, তাহলে ‘মৃতরা শুনতে পায় না’- এটাই সত্য!

লেখক: উস্তায, জামিয়া ইসলামিয়া লালমাটিয়া মাদ্রাসা, মোহাম্মাদপুর, ঢাকা-১২০৭

  যশোরের আলো
  যশোরের আলো