সোমবার   ২২ জুলাই ২০২৪   শ্রাবণ ৬ ১৪৩১   ১৪ মুহররম ১৪৪৬

  যশোরের আলো
১২১৮

সুনীল অর্থনীতি থেকে বছরে ২৫০ বিলিয়ন ডলার আয় সম্ভব

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ৫ আগস্ট ২০২৩  

দুর্লভ সন্ধিপদ প্রাণীদের একটি রাজকাঁকড়া। এই কাঁকড়ার রক্ত নীল। এক কেজি নীল রক্তের দাম কোটি টাকা। তাই চিকিৎসাবিজ্ঞানে রাজকাঁকড়ার রক্তের গুরুত্ব অপরিসীম। ভ্যাকসিন বা টিকা তৈরিতে রাজকাঁকড়ার রক্তের দরকার হয়। মূলত টিকা তৈরির পর তা কার্যকর কিনা, সেটি পরীক্ষা করতেই এই রাজকাঁকড়ার রক্তের প্রয়োজন পড়ে। একটি কাঁকড়া থেকে মাত্র কয়েক মিলিগ্রাম রক্ত মিলে। সুসংবাদ হলোসম্প্রতি কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে এই রাজকাঁকড়ার সন্ধান পাওয়া গেছে। ফলে সরকারিভাবে এই কাঁকড়া সংরক্ষণ ও এর নীল রক্ত নিয়ে গবেষণা চলছে। 

অ্যাগার-অ্যাগার এবং ক্যারাজিনান। দেখতে স্বচ্ছ জেলির মতো। ল্যাবে গবেষণামূলক কাজের জন্য এই দুটি উপাদান খুব প্রয়োজন। ওষুধ, টুথপেস্ট তৈরিতেও ব্যবহৃত হয় এটি। এছাড়া মিষ্টান্নসহ বেকারির হরেক রকমের আইটেম তৈরির উপাদান অ্যাগার-অ্যাগার এবং ক্যারাজিনান। এজন্য বছরজুড়ে এটি বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। এতে সরকারকে গুনতে হয় মোটা অঙ্কের টাকা। তাই এই উপাদান এখন সরকারিভাবে দেশেই উৎপাদন করতে যাচ্ছেন একদল গবেষক।  খাওয়া যায় এমন প্রজাতির শৈবাল থেকে এই উপাদান উৎপাদনের জন্য মহেশখালীসহ কয়েকটি জায়গায় শৈবালের চাষাবাদ করার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে।

শুধু রাজকাঁকড়া কিংবা শৈবাল নিয়ে নয়, পরিবেশ দূষণের জন্য দায়ী কার্বন ডাই-অক্সাইড; তাই উপকূলীয় গাছগাছালি কি পরিমাণ কার্বন মজুদ করে রাখে তা নিয়েও চলছে গবেষণা। সাগরতলে সন্ধান পাওয়া মিনারেলসহ দুর্লভ খনিজ পদার্থ নিয়েও চলছে বিস্তর গবেষণা। প্রকৃতির বাস্তুসংস্থান ধ্বংস না করেই এসব পদার্থ সংরক্ষণ ও শৈবাল চাষাবাদ করা হবে। এতে সমুদ্র থেকে আহরিত সম্পদে অনন্য উচ্চতায় যাবে দেশের অর্থনীতি। তাই গবেষণার মাধ্যমে সমুদ্রের সম্পত্তিকে সম্পদে পরিণত করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিকরা। তাদের মতে, সামুদ্রিক সম্পদ সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে বাংলাদেশ প্রতিবছর ২৫০ বিলিয়ন ডলার আয় করতে পারবে। এসব সম্ভাবনা মাথায় রেখে দেশে ব্লু-ইকোনমির বিপ্লব ঘটাতে কক্সবাজারের রামুতে মেরিনড্রাইভ সড়কের পাশেই ৪০ একর জায়গার ওপর নির্মাণ করা হয়েছে ‘বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট’। সরেজমিনে এই প্রতিষ্ঠান ঘুরে এবং সেখানে চলমান কার্যক্রমে এমন চিত্র দেখা গেছে।

বর্তমান সরকার ২০১৭ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করে। এতে ছয়টি  বিভাগের (ভৌত ও স্পেস, ভূতাত্ত্বিক, রাসায়নিক, জৈব, পরিবেশ ও জলবায়ু) মাধ্যমে গবেষণা পরিচালনা করা হয়। ২০১৭ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত মোট ৪৫টি গবেষণা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। যেগুলোর ফলাফল ব্লু ইকোনমির স্বপ্নকে আরও রঙিন করছে।

বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, এনভায়রনমেন্টাল ওশানোগ্রাফি ও ক্লাইমেট বিভাগের বিভাগীয় প্রধান আবু শরীফ মো. মাহবুব-ই-কিবরিয়া বলেন, প্রথমত যেসব শৈবাল রপ্তানি করা যায় সেসব শৈবাল চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে বাণিজ্যিকভাবে তোলা যাচ্ছে না। কারণ এতে প্রকৃতির বাস্তুসংস্থান নষ্ট হয়ে যাবে। তাই বাস্তুসংস্থান ঠিক রাখতে কৃত্রিমভাবে কিভাবে এসব শৈবালের চাষাবাদ করা যায়, সেই লক্ষ্যে কাজ করা হচ্ছে। এই জন্য সমুদ্র থেকে বীজ সংগ্রহ করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক উঞ্চতার জন্য কার্বন ডাই-অক্সাইডকে দায়ী করা হয়। তাই উপকূলীয় গাছগাছালি বিশেষ করে ম্যানগ্রোভ/বন কি পরিমাণ কার্বন মজুদ করে রাখে, সেটি নিয়ে গবেষণা চলছে। একটি ব্লু কার্বন স্টোর অ্যাসেসমেন্টের কাজ চলছে। এ জন্য সেন্টমার্টিন থেকে শুরু করে ভোলা-হাতিয়া পর্যন্ত উপকূলীয় এলাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া সমুদ্রের আবহাওয়া, খনিজ পদার্থ, সমুদ্রের মাছে কি পরিমাণ মাইক্রো প্লাস্টিকের উপস্থিতি রয়েছে, সেসব নিয়েও বিস্তর গবেষণা চলছে।

আবু শরীফ মো. মাহবুব-ই-কিবরিয়া আরও জানান, ব্ল ইকোনমি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই পাইলট কান্ট্রি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এজন্য আমরা বিভিন্ন গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছি এবং গবেষণার ফল আমাদের আরও বেশি আশাবাদী করছে। দ্রুতই গবেষণার জন্য একটি নিজস্ব জাহাজ যুক্ত হবে। তখন আরও ভালোভাবে আমরা কাজ করতে পারব। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের সমুদ্র এলাকায় যে পরিমাণ খণিজ, তেল, গ্যাস, মাছসহ অন্যান্য সম্পদ রয়েছে, তা দেশের অর্থনীতিকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

রামুর এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন সময়ে সমুদ্র থেকে সংগ্রহ করা বিভিন্ন নমুনা সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। এসব নমুনার মধ্যে তিমি মাছের মাংস, কাছিমের ডিম, বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, শৈবাল, জৈব পদার্থ, সাপ রয়েছে। সমুদ্র দূষণ রোধে প্লাস্টিক, জুতাসহ অন্যান্য পণ্যও রাখা হয়েছে। ভেসে আসা কচ্ছপ সংগ্রহ করে ময়নাতদন্তের পর সংরক্ষণ করা হয়েছে। এসব নমুনা  কেমিক্যালের মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের ল্যাবে এসব নিয়ে গবেষণা করেন সেখানকার বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা। নবীন গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সেখানে পরিদর্শনে যান এবং জ্ঞান অর্জন করেন। পরিচিত হন নতুন নতুন প্রজাতির বিভিন্ন প্রাণীর সঙ্গে।

২০৫০ সালে পৃথিবার জনসংখ্যা হবে ৯০০ কোটি। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর খাবার যোগান দিতে তখন সমুদ্রের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হবে। সেই লক্ষ্যে জাতিসংঘ ২০১৫ সাল পরবর্তীতে যে টেকসই উন্নয়ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে তার মূল কথাই হচ্ছেÑ ব্লু ইকোনমি। আর ব্লু ইকোনমির মূল ভিত্তি হচ্ছে টেকসই সমুদ্র নীতিমালা। বছরব্যাপী ৩ থেকে ৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের কর্মকা- সংঘটিত হচ্ছে সমুদ্রকে ঘিরে। বিশ্বের ৪৩০ কোটি মানুষের ১৫ ভাগ প্রোটিনের যোগান দিচ্ছে সামুদ্রিক মাছ, উদ্ভিদ ও প্রাণী। পৃথিবীর ৩০ ভাগ গ্যাস ও জ্বালানি তেল সরবরাহ হচ্ছে সমুদ্রতলের বিভিন্ন গ্যাস ও তেলক্ষেত্র থেকে। বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলো সমুদ্র সম্পদকে কাজে লাগাচ্ছে এবং তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আমূল পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশও সমুদ্র থেকে আহরিত সম্পত্তি সম্পদে পরিণত করার ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা ও বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে দেশের ব্লু ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতি। বাংলাদেশও ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি সমুদ্র এলাকার অর্থনীতি ঘিরে নতুন স্বপ্ন দেখছে। ব্লু ইকোনমির মূল উপাদানগুলো (খনিজ সম্পদ, মৎস্য, পানিসম্পদ, পরিবহন সেবা, জ্বালানি সম্পদ, পর্যটন শিল্প) কাজে লাগিয়ে অনন্য উচ্চতায় যেতে চাচ্ছে সরকার।

ওশানোগ্রাফিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টরা জানান, বঙ্গোপসাগরে ৪৭৫ প্রজাতির মাছ, ৩৬ প্রজাতির চিংড়ি মাছ, ২০ প্রজাতির কাঁকড়া, ৩৩৬ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক এবং বিভিন্ন প্রকার অর্থনৈতিক ও জৈব গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ রয়েছে। মৎস্যসম্পদ ছাড়াও সামুদ্রিক প্রাণী, সামুদ্রিক আগাছা, লতাগুল্মতেও ভরপুর বঙ্গোপসাগর। এসব আগাছা প্রক্রিয়াজাতকরণ করে বিভিন্ন রোগের ওষুধ তৈরি করা যায়। স্পিরুলিনা নামের আগাছা চীন, জাপান, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মানুষ খাদ্য হিসেবে খেয়ে থাকে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে সামুদ্রিক খাদ্যপণ্য রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। এছাড়া ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্র বিজয়ের পর বাংলাদেশ যে ২২টি ব্লক পেয়েছে তা থেকে প্রায় ৪০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া সম্ভব। সন্ধান পাওয়া যেতে পারে তেলের খনিরও। এদিকে, বঙ্গোপসাগরে ভারি খনিজের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে ইলমেনাইট, টাইটেনিয়াম অক্সাইড, রুটাইল, জিরকন, ম্যাগনেটাইট, কোবাল্টসহ অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। এসব সম্পদ সঠিক উপায়ে উত্তোলন করতে পারলে হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব হবে। সমুদ্রপথ কাজে লাগিয়ে নৌযান নির্মাণ শিল্প আরও সমৃদ্ধ করার সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশের উপকূল এলাকা পূর্ব, মধ্যম ও পশ্চিম এই ৩ ভাগে বিভক্ত। এই তিনটি জোনের মধ্যে পূর্ব এলাকার (কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিন) উপকূল ও এর কাছাকাছি অঞ্চলের পানি ও বালি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভূতাত্ত্বিক প্যারামিটার নির্ণয়ের মাধ্যমে বিদ্যমান সম্পদ চিহ্নিতের চেষ্টা চলছে। গবেষণার ফল অনুযায়ী কক্সবাজার সমুদ্র এলাকায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হেভি মিনারেল (খনিজ) পাওয়া গেছে। জাহাজ নিয়ে সংগ্রহ করা স্যাম্পল পরীক্ষা করে চিহ্নিত করা হয়েছে ৭২ প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল। যা ব্লু ইকোনমির অপার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। দ্রুতই গবেষণার জন্য একটি বিশেষ জাহাজ  দেবে সরকার। তখন গবেষণায় জন্য বিভিন্ন উপাদান সাগর থেকে সহজে সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। এতে গবেষণা অন্য মাত্রায় যুক্ত হবে। যোগ হবে নতুন অর্থনীতির চাকা।

ওশানোগ্রাফিক ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তারা জানান, ব্লু ইকোনমি উন্নয়নের জন্য স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় দেশের পূর্ব উপকূল সংলগ্ন সেন্ট মার্টিন দ্বীপ থেকে কুতুবদিয়া পর্যন্ত ৫০০০ বর্গ কিলোমিটার সমুদ্র এলাকার খনিজ সম্পদ চিহ্নিতকরণ, ভূতাত্ত্বিক, ভৌত, রাসায়নিক ও জৈব উপাদানসমূহ চিহ্নিতকরণ করা হয়েছে। মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় কক্সবাজারে মেরিন অ্যাকুরিয়াম স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সমুদ্র উপকূলের  তেল নিঃসরণ, মেরিন অ্যাকুয়াকালচার (মেরিকালচার), কাঁকড়া ও ঝিনুকের খাদ্যগুণ পরীক্ষা করা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় গভীর সমুদ্রের খনিজ চিহ্নিতকরণ ও গবেষণার কাজ করা হচ্ছে। এছাড়া মেরিকালচার (মেরিন অ্যাকুয়াকালচার) দ্বারা সামুদ্রিক মৎস্য উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত এলাকা চিহ্নিত করার জন্য ম্যাপিং করা হয়েছে।

পূর্ব উপকূলীয় সমুদ্র এলাকার ৭৫০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় ভারি খনিজ ও পলি বণ্টন প্রক্রিয়া নির্ধারণের জন্য সামুদ্রিক ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধান সম্পন্ন করা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের জেলিফিশের বিতরণ এবং অর্থনৈতিক ব্যবহার পরিমাপ করা হয়েছে। বাংলাদেশের উপকূলীয় সামুদ্রিক এলাকার সম্ভাব্য মাছ ধরার অঞ্চল খুঁজে বের করার জন্য আপওয়েলিং জোন এবং সমুদ্র স্তরবিন্যাস নির্ধারণ করা হয়েছে। সেন্টমার্টিন দ্বীপে ৬০টির বেশি প্রজাতির প্রবাল শনাক্ত করা হয়েছে।

 

  যশোরের আলো
  যশোরের আলো
এই বিভাগের আরো খবর