সোমবার   ০৩ অক্টোবর ২০২২   আশ্বিন ১৭ ১৪২৯   ০৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

  যশোরের আলো
সর্বশেষ:
যশোরে আগাম শীতকালীন সব‌জি চাষ, ভালো দামে খু‌শি কৃষক দুর্গাপূজা উপলক্ষে বেনাপোলে ৪ দিন বন্ধ আমদানি-রফতানি ঝিনাইদহে ছড়িয়ে পড়ছে লাম্পি স্কিন ডিজিজ, দিশেহারা খামারিরা ঝিনাইদহ পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলরদের শপথ গ্রহণ জিনপিংকে শুভেচ্ছা জানিয়ে হামিদ-হাসিনার চিঠি যশোর ভবদহের ধলিয়ার বিলে নির্মিত হবে ইপিজেড
১৮৪

বেনাপোলে পণ্য আমদানিতে অভাবনীয় গতি সঞ্চার

প্রকাশিত: ৫ আগস্ট ২০২২  

পশ্চিমবঙ্গে 'অনলাইন সস্নট বুকিং সিস্টেম' চালু হওয়ায় বেনাপোলে পণ্য আমদানিতে অভাবনীয় গতি এসেছে। আগে আমদানি পণ্য দেশে প্রবেশ করতে পেট্রাপোলে ৩০ থেকে ৪০ দিন অপেক্ষা করতে হতো। গুনতে হতো বাড়তি ডিটেনশন চার্জ; গোডাউন ভাড়া। 

আমদানিকারকদের মতে, এই খাতে বছরে বাড়তি ব্যয় হতো প্রায় হাজার কোটি টাকা। এখন তিন দিনেই পেট্রাপোল থেকে বেনাপোল বন্দরে প্রবেশ করছে ভারতীয় পণ্যবাহী ট্রাক। ফলে দ্রম্নততম সময়ে পণ্য আমদানির পাশাপাশি সাশ্রয় হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।

পেট্রাপোল সূত্রগুলো জানায়, বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের স্থলবন্দর দিয়ে ট্রাকে পণ্য রপ্তানি সংক্রান্ত কাজে স্বাচ্ছন্দ্য আনতে সম্প্রতি পরিবহণ দপ্তর অনলাইন সস্নট বুকিং সিস্টেম বা 'সুবিধা ভেহিকেলস ফেসিলিয়েশন সিস্টেম' চালু করেছে।

পুরনো ব্যবস্থায় বাইরের রাজ্য থেকে আসা পণ্যবাহী ট্রাক পেট্রাপোল বন্দরে যাওয়ার আগে বনগাঁ শহরের তিনটি জায়গায় (কালীতলা, কালীবাড়ি মোড় এবং বিএসএফ ক্যাম্প মোড়) পরিবহণ দপ্তরের কাছে এন্ট্রি করতে হতো। তারপর সীমান্তে যাওয়ার জন্য ছাড়পত্রের জন্য অপেক্ষা করতে হতো। এই ছাড়পত্র মিলতে এক মাস বা তারও বেশি সময় লাগত। ততদিন ট্রাকের মালামাল স্থানীয় গোডাউন বা স্থানীয় ট্রাকে তুলে বেসরকারি পার্কিং লটে রাখা হতো। 

বাইরে থেকে আসা বেশিরভাগ ট্রাক বনগাঁয় পণ্য নামিয়ে ফিরে যেত। এ কারণে বনগাঁয় বহুসংখ্যক গোডাউন এবং পার্কিং লট রয়েছে। বনগাঁর পার্কিং ও গোডাউন ঘিরে এই সিন্ডিকেটকে কালীতলা সিন্ডিকেটও বলা হয়। এই চক্রে ৩০ থেকে ৪০ দিন আটকে থেকে পণ্যবোঝাই প্রতি ট্রাককে গড়ে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা বাড়তি গুনতে হতো। বছরে যা প্রায় হাজার কোটি টাকা।

ওপারের পরিবহণ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থাপনায় ভারতের যেকোনো প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা স্থল বন্দর দিয়ে বাংলাদেশে ট্রাকে পণ্য পরিবহণের জন্য আগেভাগেই অনলাইনে 'সস্নট বুকিং' করতে পারবেন। এই কাজে চেসিসের জন্য লাগবে ৫ হাজার টাকা এবং পণ্যবোঝাই ট্রাকের জন্য ১০ হাজার টাকা। নতুন এই ব্যবস্থাপনায় ভেঙে গেছে কালীতলা পার্কিং সিন্ডিকেট।

আমদানি বাণিজ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকার বনগাঁ কালিতলা পার্কিং সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে পশ্চিমবাংলা সরকারের পরিবহণ দপ্তর অনলাইনে সস্নট বুকিং চালু করায় ভারতের যেকোনো প্রদেশ হতে ট্রাক কলকাতায় এসে পৌঁছানোর পর ১-২ দিনের মধ্যে বেনাপোলে পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে খুশি ব্যবসায়ীরা। 

তারা বলছেন, উভয় দেশের সরকারি কর্মকর্তারা বিশেষ করে ভারতীয় পরিবহণ দপ্তর, বন্দর কাস্টমস এবং বেনাপোল কাস্টমস ও পোর্ট এলপিআই নিয়মিত তদারকি করলে ভারতীয় পণ্যবাহী ট্রাক প্রবেশে বনগাঁ পার্কিং সিন্ডিকেটের ডিটেনশন চিরতরে হারিয়ে যাবে।

বাংলাদেশ-ভারত চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক মতিয়ার রহমান জানান, বাংলাদেশের প্রতিটি আমদানিকারক ঋণপত্র খোলার সময় পণ্যের মূল্যের সঙ্গে বনগাঁ, কালিতলা পার্কিং এর ৩০-৩৫ দিনের ট্রাক ডিটেনশন চার্জ ও মালবাহী ট্রাক চার্জ উল্লেখ করে তার ওপর আমদানিকারককে শুল্ক পরিশোধ করতে হতো। গত এক দশক ধরে প্রতি বছর প্রায় হাজার কোটি টাকা শুধু কালিতলা পার্কিং ও ডিটেনশন চার্জ বাবদ দেওয়া হয়েছে। 

শুধু তাই নয়, দিল্লি, মুম্বাই অথবা ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে একটি ট্রাক পেট্রাপোলে আসার পর পণ্য লোকাল গোডাউনে আনলোড করে রাখত। পরবর্তীতে সেই একই পণ্য দু'টি ট্রাকে লোড করে বেনাপোলে পাঠানো হতো, যা ঋণপত্রের শর্তবহির্ভূত। এলসিতে পার্ট শিপমেন্ট অনুমোদন থাকলেও ট্রান্সশিপমেন্টের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা থাকে। বনগাঁ পার্কিং সিন্ডিকেট ট্রাকের ভুয়া নম্বর দিয়ে এন্ট্রি করে রাখা হতো। পরবর্তীতে সেই সিরিয়াল নম্বর পঞ্চাশ হাজার টাকায়ও বিক্রি করা হতো।

বেনাপোল বন্দরের আমদানি রপ্তানি সমিতির সহসভাপতি আমিনুল হক বলেন, একটা সময় কোনো পণ্যবাহী ট্রাক এন্ট্রি নেওয়ার পর ৩০ থেকে ৪০ দিন আটকে থাকতে হতো। তারপরও দালালদের টাকা দিয়ে পণ্য দেশে ঢুকত। এই পুরনো ব্যবস্থা পাল্টাতে মাস্টারস্ট্রোক দেয় পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার। পৌরসভার হাত থেকে পার্কিং নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নিয়ে তা তুলে দেওয়া হয় পরিবহণ দপ্তরের হাতে। নয়া সিদ্ধান্তের পর দেখা গেছে, জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে আটকে থাকা গাড়ির সংখ্যা ও দিন অনেক হ্রাস পেয়েছে। এখন ৩০/৪০ দিন নয়, তা কমে তিন দিনে নেমে এসেছে। কোনো কোনো গাড়ি এন্ট্রি হওয়ার দিনই ঢুকছে বাংলাদেশে। ফলে অভাবনীয় গতি এসেছে পণ্য আমদানিতে; স্বস্তি ফিরেছে বাণিজ্যে।

সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী ইদ্রিস আলী জানান, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এমন পদক্ষেপে পণ্য পরিবহণ ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে আমদানিকারকদের মধ্যে দ্রম্নত পরিবহণ করা যাচ্ছে পণ্য।

বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ স্টাফ অ্যাসোসিয়েশন সহসভাপতি কামাল হোসেন জানান, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এমন উদ্যোগে দুই দেশের ব্যবসায়ীরাই খুশি। তবে ট্রাক প্রতি সেবা চার্জ ১০ হাজার রুপি ও ট্রাক চ্যাসিস চার্জ ৫ হাজার রুপি নির্ধারণ করা হয়েছে। এই চার্জ কিছুটা কমালে আরও উপকৃত হবেন ব্যবসায়ীরা।

পেট্রাপোল ক্লিয়ারিং এজেন্ট স্টাফ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক কার্তিক চক্রবর্তী বলেন, 'ভুয়া এন্ট্রি বন্ধ হওয়ায় এখন দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে গাড়ি বাংলাদেশ পৌঁছে যাচ্ছে। আগামী দিনে এই বন্দরে কাজের পরিমাণও বাড়বে।' রপ্তানি বাণিজ্য করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ব্যবসায়ীদের উৎসাহ বাড়বে বলে মনে করছেন শুল্ক দপ্তরের অধিকারীরাও।

বেনাপোল বন্দরের উপ-পরিচালক (ট্রাফিক) মামুন কবীর তরফদার বলেন, ওপারে 'অনলাইন সস্নট বুকিং সিস্টেম' চালু হওয়ায় পণ্য আমদানিতে দীর্ঘসূত্রতা কেটেছে। দুই দেশের সরকারের চেষ্টায় ভারতের রাজ্য সরকারের এই নতুন নির্দেশে পেট্রাপোলের আমদানি বাণিজ্যে গতি এসেছে, গতি এসেছে বেনাপোলে। আমরা আশাবাদী আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য আরও গতিশীল হবে, ব্যবসায়ীরা পেট্রাপোল-বেনাপোল বন্দর ব্যবহারে আরও আগ্রহী হবে।

  যশোরের আলো
  যশোরের আলো
এই বিভাগের আরো খবর