সোমবার   ০৮ আগস্ট ২০২২   শ্রাবণ ২৪ ১৪২৯   ১০ মুহররম ১৪৪৪

  যশোরের আলো
সর্বশেষ:
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে যে কারণে তেলের দাম বৃদ্ধি যৌক্তিক খুলনা-যশোর অঞ্চলে ১৭১ রেলগেটের ৯৮টি অরক্ষিত যশোরে এক মাসে হারানো ৪৯টি মোবাইল উদ্ধার বেনাপোলে পণ্য আমদানিতে অভাবনীয় গতি বাস-মিনিবাসের ভাড়া পুনঃনির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি
৭২

হলি আর্টিজানে হামলার ৬ বছর; যেভাবে চিহ্নিত ৫১২ জঙ্গি

প্রকাশিত: ১ জুলাই ২০২২  

রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানে হোলি আর্টিজান বেকারি ও রেস্টুরেন্টে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার ঘটনার ছয় বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ। ২০১৬ সালের আজকের এই দিনে গুলশান-২ নম্বরে হোলি আর্টিজানে জিম্মি করে দেশি-বিদেশি ২০ জনকে হত্যা করে জঙ্গিরা।

বিশ্বব্যাপী আলোচিত ভয়াবহ ওই ঘটনার পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একের পর এক অভিযানে জঙ্গিদের কোণঠাসা করে ফেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) অভিযানে জঙ্গি তৎপরতায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে এ পর্যন্ত অন্তত ৫১২ জন চিহ্নিত হয়। তবে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে এখনো জিরো টলারেন্সে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর হোলি আর্টিজানে হামলার ঘটনায় করা মামলায় সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনাল। সূত্র জানায়, এরপর আসামিরা সবাই জেল থেকে আপিল করে। পাশাপাশি ট্রাইব্যুনালের রায়ে খালাস পাওয়া একজনের বিরুদ্ধেও আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ।

দেশে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ভূমিকায় সবচেয়ে সফলতা দেখিয়েছে ডিএমপির সিটিটিসি। সংস্থাটি জঙ্গি তৎপরতা নিয়ে এ পর্যন্ত ৩৪টি গবেষণা কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। একই সঙ্গে ২০১৬ সাল থেকে বিভিন্ন সময় গ্রেফতার এবং দুই শর বেশি মামলা পর্যালোচনা করে ওই ৫১২ জনকে চিহ্নিত করেছে।

গতকাল ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে সিটিটিসির প্রধান মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘সিটিটিসিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কল্যাণে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এ মুহূর্তে বড় ধরনের কোনো জঙ্গি হামলার হুমকি ও আশঙ্কা আমরা দেখছি না। ওই ধরনের সক্ষমতাও জঙ্গি সংগঠনগুলোর নেই। হোলি আর্টিজান হামলার পর সব জঙ্গির সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।’

এদিকে সিটিটিসির গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে জঙ্গিবাদে যারা জড়িয়েছেন তাদের ৬১ ভাগের বেশি তরুণ। আর তাদের মধ্যে ৭৩ ভাগের বেশি সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত। সচ্ছল পরিবারের এসব তরুণ পারিবারিক, রাজনৈতিক, ভাবাদর্শগতসহ ৮টি কারণে ছয়টি ধাপে জঙ্গিবাদে জড়াচ্ছেন, যাদের অধিকাংশের অভিভাবকরাই শুরুতে বিষয়টি বুঝে উঠতে পারেন না। যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয় তখনই জানতে পারেন সন্তান জড়িয়েছে জঙ্গিবাদে। ১৭ থেকে ৩৪ বছর বয়সীরা বেশি জঙ্গিবাদে জড়াচ্ছে। কারণ তাদের সহজে উদ্বুদ্ধ করা যায়। এ সময় তাদের যে মানসিক অবস্থা থাকে সে মানসিক অবস্থা থেকে যে-কাউকে যে কোনো দিকে ট্রান্সফরম (রূপান্তর) করা হয়।

সিটিটিসির কর্মকর্তারা বলছেন, জঙ্গিরা হুট করেই একজনকে উদ্বুদ্ধ করে না। তার আচার-আচরণ দেখে, পারিপার্শি¦কতা দেখে টার্গেট করে। যদি অনলাইনে রেডিক্যালাইজ করে তবে তাকে দীর্ঘদিন অনলাইনে অনুসরণ করে তারা। যদি কাউকে ফিজিক্যালি উদ্বুদ্ধ করে তবে দীর্ঘদিন তার আচার-আচরণ অনুসরণ করে। একসময় কোনো এক দুর্বল মুহূর্তে তাকে দাওয়াত দেয়।

বিভিন্ন সময় গ্রেফতার হওয়া জঙ্গিদের তথ্য ঘেঁটে সিটিটিসি বলছে, নিষিদ্ধ-ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের সক্রিয় একটি গ্রুপের প্রধান হাসিবুর রহমান ওরফে আযযাম আল গালিব (২১)। মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির এলএলবির শিক্ষার্থী তিনি। পটুয়াখালীর মহীপুর এলাকার হাবিবুর রহমানের ছেলে হাসিবুর ২০১৬ সালে এসএসসি পাস করে ঢাকার অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তির পর সহিংস উগ্রবাদ তথা জঙ্গিবাদের আদর্শে দীক্ষিত হন। গত বছর ১৪ নভেম্বর তাকে গ্রেফতার করে সিটিটিসি। 

সিটিটিসির গবেষণায় বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জঙ্গিবাদে যারা জড়াচ্ছেন তাদের অধিকাংশই তরুণ ও উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত। এর মধ্যে ৬১.১ ভাগই ২০ থেকে ৩৪ বছর বয়সী। তবে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সীরা বেশি জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ছে, শতকরা হিসাবে যা ২৭.৫ ভাগ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীরা, যা শতকরা হিসাবে ২০.১ ভাগ। 

এর পরই রয়েছে ৩০ থেকে ৩৪ বছর বয়সীরা, যা শতকরা হিসাবে ১৩.৫ ভাগ। আর ৩৫ থেকে ৩৯ বছর বয়সী ৯.৪ ভাগ, ৪০ থেকে ৪৪ বছর বয়সী ৮ ভাগ এবং ৪৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী ৩.৩ ভাগ। এ ছাড়া ৫০ থেকে ৬৪ বছর বয়সী ৩ ভাগ। কিশোর বয়সীরাও জড়িয়ে পড়ছে জঙ্গিবাদে, যা শতকরা হিসাবে ৭.৬ ভাগ। 

চিহ্নিত হওয়া ৫১২ জনের শিক্ষাগত যোগ্যতা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জঙ্গিবাদে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিতরাই বেশি জড়াচ্ছে। শতকরা হিসাবে এর সংখ্যা ৭৩.২ ভাগ। এর পরই রয়েছে মাদরাসা শিক্ষায় শিক্ষিতরা, শতকরা হিসাবে যা ২৩ ভাগ। তারপর রয়েছে ভোকেশনাল ২.১ ভাগ। আর শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই এমন রয়েছে ১.৬ ভাগ।

জানা গেছে, এখন পর্যন্ত সরকার ৮টি জঙ্গি সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। সর্বপ্রথম ২০০৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় শাহাদাত-ই আল-হিকমাকে। এরপর বিভিন্ন সময় জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ, জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ, হরকাতুল জিহাদ আল-ইসলামী অব বাংলাদেশ (হুজি), হিযবুত তাহ্রীর, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, আনসার আল ইসলাম এবং সর্বশেষ ২০১৯ সালে আল্লাহর দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সরকার।

এদিকে ২০০৮ সালে জন্ম নেওয়া আনসারুল্লাহ বাংলা টিম বা আনসার আল ইসলাম ২০১৩ সালে ব্লগার হত্যার মধ্য দিয়ে আলোচনায় আসে। তবে গত ছয় বছরে সংগঠনটির দৃশ্যমান তৎপরতা বা কোনো নাশকতার খবর পাওয়া যায়নি। কিন্তু আনসার আল ইসলাম বিভিন্ন অ্যাপে গ্রুপ খুলে নিজস্ব যোগাযোগব্যবস্থা দাঁড় করিয়েছে। নিষিদ্ধ এই সংগঠনও সদস্য ও সমর্থক বৃদ্ধির চেষ্টায় আছে। এরা অনলাইনে উগ্রবাদ ছড়ানোর ক্ষেত্রে বেশি সক্রিয়।

খোঁজ নেই পুরস্কার-ঘোষিত দুই শীর্ষ জঙ্গির : ছয় বছরের বেশি সময় ধরে পুরস্কার-ঘোষিত দুই শীর্ষ জঙ্গির খোঁজ মিলছে না। তারা কোথায় সে তথ্যও নেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে। অথচ তাদেরসহ ছয় শীর্ষ জঙ্গিকে ধরিয়ে দিতে ২০১৬ সালের ১৯ মে ২ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কার ঘোষণা করেছিল ডিএমপি। তারা ব্লগার, প্রগতিশীল লেখক ও প্রকাশক হত্যাকাণ্ডে জড়িত।

পুরস্কার-ঘোষিত আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) শীর্ষ জঙ্গিরা হলেন- শরিফুল ওরফে সাকিব ওরফে শরিফ ওরফে সালেহ ওরফে আরিফ ওরফে হাদী-১, সেলিম ওরফে ইকবাল ওরফে মামুন ওরফে হাদী-২, সিফাত ওরফে সামির ওরফে ইমরান, আবদুস সামাদ ওরফে সুজন ওরফে রাজু ওরফে সালমান ওরফে সাদ, শিহাব ওরফে সুমন ওরফে সাইফুল এবং সাজ্জাদ ওরফে সজীব ওরফে সিয়াম ওরফে শামস।

এদের বিষয়ে জানতে চাইলে সিটিটিসি কর্মকর্তা বলেন, ‘দু-একজন বাকি আছে, তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’

সূত্র জানায়, শরিফুল ওরফে সাকিব ওরফে শরিফ ওরফে হাদী-১ ২০১৬ সালের ১৯ জুন ডিবি পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। এর আগে একই বছর ১৫ জুন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকা থেকে শিহাব ওরফে সুমন ওরফে সাইফুলকে গ্রেফতার করা হয়। 

একই বছর ২৩ আগস্ট রাতে গাজীপুরের টঙ্গীর চেরাগ আলী মার্কেটে অভিযান চালিয়ে সিফাত ওরফে সামির ওরফে ইমরানকে গ্রেফতার করে ডিবি। ওই বছর ৩ সেপ্টেম্বর রাতে টঙ্গী স্টেশন থেকে আবদুস সামাদ ওরফে সুজন ওরফে রাজু ওরফে সালমান ওরফে সাদকে গ্রেফতার করা হয়। তবে সেলিম ওরফে ইকবাল ওরফে মামুন ওরফে হাদী-২ এবং সাজ্জাদ ওরফে সজীব ওরফে সিয়াম ওরফে শামসের খোঁজ এখনো মেলেনি।

  যশোরের আলো
  যশোরের আলো
এই বিভাগের আরো খবর