সোমবার   ০৮ আগস্ট ২০২২   শ্রাবণ ২৩ ১৪২৯   ১০ মুহররম ১৪৪৪

দোয়া ও মোনাজাতে আরও মনোযোগী হওয়া উচিৎ

নিউজ ডেস্ক:

যশোরের আলো

প্রকাশিত : ০৮:৪৯ পিএম, ৩০ এপ্রিল ২০২০ বৃহস্পতিবার

অনেক মানুষকে দেখা যায় নামাজ শেষ করে এত ছোট্ট একটি মোনাজাত বা দোয়া করেন যে, সেখানে কী বলেছেন তিনি নিজেও জানেন না। হাতটা শুধু মুখে মুছতে দেখা যায়। কেন এ রকম অবহেলা? দোয়া মানেই হল আমার কী কী লাগবে, আমি কী কী চাই তা আল্লাহর কাছ থেকে চেয়ে নেয়া। এটা কেমন হওয়া উচিত ছিল? আর হচ্ছে কেমন?

 

কোনো প্রভাবশালী ধনী ব্যক্তি যদি আমাদের কাউকে বলেন যে, তোমার কী কী প্রয়োজন সব বল, আমি তোমার সব প্রয়োজন পূরণ করব। তখন আমরা তার কাছে আমাদের প্রয়োজনগুলি কীভাবে বলব?

প্রথমে তাঁর প্রশংসা করব। তারপর বিভিন্ন ব্যক্তিকে দেয়া তার দানের উপকারিতা বলে তাকে খুশি করব। তারপর আমার প্রয়োজনগুলির লিস্ট বলার আগে এমন একটি ভূমিকা বলব যাতে তিনি আমার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন।

তারপর আমার প্রয়োজনগুলি বলে এগুলোর গুরুত্বের উপর সামান্য আলোচনা করব। তারপর আমার প্রয়োজনগুলি তিনি যেন পূরণ করে দেন সেভাবে তার কাছে মিনতির সুরে আমার চাওয়াগুলি পেশ করব। তারপর তার বাবা,মা ও সন্তানদের জন্য দোয়া করে কথা শেষ করব।

কিন্তু গোটা দুনিয়া ও আখেরাতের মালিক, আরশ-কুরসির মালিক, বিশ্বব্রম্মান্ডের সৃষ্টিকর্তা আমাদেরকে ভাল-মন্দ দেয়ার মালিক, আমাদের প্রতিপালক মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে মোনাজাত করার সময় আমাদের এই অবহেলা অমার্জনীয় অপরাধ হিসেবেই গণ্য হতে পারে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে ক্ষমা করুন।

দোয়া এমন একটি জিনিস যাতে দুনিয়া ও আখেরাতের সফলতা নিহিত রয়েছে। দোয়া করতে কোনো ধরণের প্রস্তুতি বা আয়োজন লাগে না। নামাজের জন্য অজু লাগে এবং নির্দিষ্ট নিয়মে আদায় করতে হয়। কিন্তু দোয়ার জন্য সেটাও লাগে না। শোয়া, বসা বা দাঁড়ানো যেকোনো অবস্থাই দোয়া করা যায়।

তবে অজুর সহিত নামাজের পরে এবং কিছু নির্দিষ্ট সময়ে করলে ফল ভাল পাওয়া যায়। আল্লাহ তা’আলা বান্দার দোয়া কবুল করবেন বলে ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন। বলেছেন: وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ অর্থাৎ তোমাদের পালনকর্তা বলেন, তোমরা আমাকে ডাক, আমি সাড়া দেব। সুরা গাফের ৬০।

অন্য আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেন: وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ ۖ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ ۖ فَلْيَسْتَجِيبُوا لِي وَلْيُؤْمِنُوا بِي لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ অর্থাৎ আর আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে আমার ব্যাপারে বস্তুতঃ আমি রয়েছি সন্নিকটে। যারা প্রার্থনা করে, তাদের প্রার্থনা কবুল করে নেই, যখন আমার কাছে প্রার্থনা করে। কাজেই আমার হুকুম মান্য করা এবং আমার প্রতি নিঃসংশয়ে বিশ্বাস করা তাদের একান্ত কর্তব্য। যাতে তারা সৎপথে আসতে পারে। সুরা আল বাকারা, ১৮৬।

দয়ালু আল্লাহর এ রকম রহমতপূর্ণ ঘোষণার পরেও দোয়া করতে অবহেলা করা সত্যই দুর্ভাগ্যজনক। আল্লাহ আমাদেরকে দোয়া করার তাওফিক দিন এবং তিনি মেহেরবানি করে আমাদের দোয়া কবুল করুন।

সালাম কালামের সময় দোয়া করার নিয়মটা আরবরাষ্ট্রগুলোতে প্রচলিত আছে। বিশেষ করে কারো ব্যাপারে দুঃসংবাদ শুনার পর সাথে সাথে দোয়া করে দেয়া। এই রীতিটা আমাদের দেশেও চালু করা উচিত।

কেও যখন আপনাকে/আমাকে বলে ‘ভাই আমার জন্য একটু দোয়া করবেন’ তখন আমরা বলি ইনশাআল্লাহ। এখানে ইনশাআল্লাহ বলা হলেও পরে আর দোয়া করতে মনে থাকে না। তাই আমাদের উচিত সাথে সাথে দোয়া করে দেয়া। অন্তত এতটুকু বলে দোয়া করতে পারি যে, ‘আল্লাহ আপনাকে কামিয়াব/সফল করুন’।

দোয়া কবুল হওয়ার উত্তম সময়গুলোর মধ্যে রয়েছে তাহাজ্জুদের সময়, আজান ও একামতের মাঝখানে, শুক্রবার আছরের নামাজের পর, কোনো ভাল কাজ করার পর, নাজের পর ইত্যাদি।

দোয়ার মাধ্যমেই জীবনের গতি পরিবর্তন সম্ভব, এমনকি তাকদির পর্যন্ত এই দোয়ার মাধ্যমে পরিবর্তন হতে পারে। যারা পাথরে ভাগ্য ফেরে বিজ্ঞাপনের পেছনে ঘুরেন এবং জ্যোতিষীর কাছে যান, তারা জ্যোতিষী আর পাথর বাদ দিয়ে এবার দোয়ার মাধ্যমে ভাগ্য ফেরানোর চেষ্টা করুন।

হাদিস শরিফে এসেছে, لا يرد القدر إلا الدعاء অর্থাৎ তাকদিরকে কোনো কিছুই রদ করতে পারে না দোয়া ছাড়া। আর দোয়ার গুরুত্ব বুঝাতে হাদিস শরিফে বলা হয়েছে الدعاء مخ العبادة অর্থ দোয়া ইবাদতের মগজ (মূল)। অন্য হাদিসে আছে الدعاء هو العبادة অর্থ দোয়া সেটি ইবাদত।

আমরা হাঁটাচলা, বা গাড়িতে বসা অবস্থায়ও দোয়া করতে পারি। নামাজে রুকু ও সিজদার তাসবিহ এর পর দোয়া করতে পারি। اللهم اغفرلي واوحمني وارزقني وانصرني ولوالدي ইত্যাদি।

সবচেয়ে ভাল হয় দুই রাকাত নামাজ আদায়ের পর (তাহাজ্জুদের পর হলে বেশি ভাল হয়)খুব বিনয়ের সাথে খুব মনোযোগের সহিত কান্নাকাটির মাধ্যমে দোয়া করা। কবুল হওয়ার আশা রাখা। নিচু শব্দে দোয়া করা। গোপনে দোয়া করা ইত্যাদি।

অনেকেই মনে করেন আমরা ত আরবি পারি না, তাই দোয়াটা ইমাম সাহেবকে দিয়ে করিয়ে নেই। আবার অনেকে মা বাবার কবর জিয়ারতের কাজটাও ইমাম সাহেবকে দিয়ে করিয়ে নেন। ধর্মীয় জ্ঞানের অভাবের কারণে তারা এ রকম করেন। মনে রাখতে হবে আল্লাহ তা’আলা সব ভাষা বুঝেন। এমনকি মনের কথাও তিনি বুঝেন। আরবি না জানলেও সমস্যা নাই। আপনি আপনার নিজের ভাষায় দোয়া করুন। আল্লাহ তা’আলা আমাদের দোয়া কবুল করবেন ইনশাআল্লাহ।