মঙ্গলবার   ০৯ আগস্ট ২০২২   শ্রাবণ ২৪ ১৪২৯   ১০ মুহররম ১৪৪৪

পিতার চোখের মনি

যশোরের আলো

প্রকাশিত : ০৯:১৩ পিএম, ৩ ডিসেম্বর ২০২১ শুক্রবার

একটি উপস্থাপিত স্বপ্ন প্রস্তাবনার পরিকল্পিত মৃত্যুর কথা উঠে আসবে এখন। আর শুরুটা করতে চাই ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর দিয়ে। তৎকালীন সামরিক শাসক জেনারেল আইয়ুব খানের চাপিয়ে দেওয়া গণবিরোধী ‘জাতীয় শিক্ষানীতি’ বাতিল করে সবার জন্য শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং একটি গণমুখী, বিজ্ঞানমনস্ক ও অসাম্প্রদায়িক শিক্ষাব্যবস্থা অর্জনের লক্ষ্যে ছাত্রসমাজ অপ্রতিরোধ্য আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। 

সে সময়ে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি। ইতিহাস জানায় তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব বেগবান করেছিল সে আন্দোলনকে। গ্রেপ্তার হতে হয়েছিল সে সময়। কারাভোগ করেছিলেন ছয়মাসের অধিক সময়।

ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক পদে থাকা শেখ ফজলুল হক মনি শুধু ছাত্র অধিকার নিয়েই কাজ করেছেন বিষয়টা তেমন না। বরং রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভেবেছেন, লিখেছেন আইডিয়া আকাড়ে এবং তা দেখিয়েছেন জাতির পিতাকে, এমন সাক্ষ্যই দেয় বিভিন্ন দলিল। 

কীভাবে রাজনীতিতে এলেন শেখ ফজলুল হক মনি? আসলে তিনি রাষ্ট্র কাঠামো নিয়ে ভাবতেন, বলতেন, জন্ম দিতেন নতুন নতুন আইডিয়ার। জহরত চিনতে তো খাটি জহুরির ভুল হবার কথা নয়, জাতির পিতাও সে ভুল করেননি। 

বঙ্গবন্ধুর মেজ বোন শেখ আছিয়া বেগম স্বামীর চাকরিসূত্রে কলকাতায় থাকতেন। বঙ্গবন্ধু কলকাতায় থাকাকালীন অধিকাংশ সময় এই বোনের বাড়িতে থাকতেন। সেই সূত্রেই শেখ মনির মেধা ও মননের সাথে পরিচয় ঘটে বঙ্গবন্ধুর। একদিন তিনি আছিয়া বেগমকে বললেন, “বুঁজি তোমার মনিকে আমারে দাও, ও রাজনীতি করুক।” 

আছিয়া বেগমও আপত্তি করেননি। যে ছেলেটি লিখতেন কবিতা, ছোটগল্প তার হাতে ১৯৬০ এলো দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব। 

পরপর দুই মেয়াদে সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ছাত্রলীগের। ছাত্রদের মননে রোপন করেছিলেন স্বাধীনতার স্বপ্ন, যা তিনি দেখেছিলেন পিতা মুজিবের চোখে। 

তখন দেশে যুদ্ধ চলছে। চলছে ভিনদেশি ষড়যন্ত্র। মুক্তিপাগল যোদ্ধাদের আবেগ তো আর কিনে নেয়া যায় না, তাই ষড়যন্ত্রকারীদের লক্ষ্য ছিল দেশপাগল মানুষগুলোকে বিভ্রান্ত করা। কিন্তু তা ঠেকাতে প্রকাশ্যে আসে মুজিববাহিনী। যার নেতৃত্বে ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি। 

তার সাথী হয়েছিলেন সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদদের মত নেতারা। তাদের বুদ্ধিদীপ্ত প্রতিটি পদক্ষেপের কারণেই বিভ্রান্ত করা যায়নি দেশের জন্য জীবনবাজি রাখা মহাত্মাদের।

শেখ ফজলুল হক মনির রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় মুগ্ধ বঙ্গবন্ধু দেশকে বঞ্চিত করতে চাননি এমন আইডিয়াবাজ নেতৃত্ব থেকে। এদিকে ছাত্র সংগঠনে থাকার বয়স ও যে নেই তার। সদ্য স্বাধীন দেশের বিভিন্ন সমস্যাসঙ্কুল বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়াতে মনিকে দরকার। দরকার তার একটা টিম। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু নির্দেশ দিলেন যুবলীগ গঠনের। 

পরাধীন দেশের ছাত্রলীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মনি যখন স্বাধীন দেশের একটি যুব সংগঠনের নেতৃত্ব কাঁধে নিলেন তখন প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। চারিদিকে যুদ্ধের ক্ষত, পরাজিত শক্তিরা বিভিন্ন প্রচারণায় মত্ত। সদ্য স্বাধীন দেশের যুবসমাজ নানাবিধ হতাশায় ভুগবে, এটা স্বাভাবিক। সেই প্রেক্ষাপটে যুবসমাজের চোখে দেশ পুননির্মাণের স্বপ্ন গেঁথে দেয়ার এক ব্রত নিয়ে নামেন শেখ ফজলুল হক মনি। বোঝান পরবর্তী প্রজন্মের জন্য যুব সমাজের দায়ের কথা।

একজন সাংবাদিককে পেশাগত কারণেই পড়তে হয় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে, শেখ ফজলুল হক মনি সাংবাদিকতাও করেছেন। নিজের পাঠাভ্যাসের সুফল কাজে লাগিয়ে যুবসমাজকে বইমুখী করার এক আইডিয়াও তিনি বাস্তবায়ন করেছিলেন। যে দৃশ্য আজ মৃতপ্রায় কিংবা নেই বললেও চলে।

কারো উপর বাজি ধরে জিতে গেলে মানুষ আনন্দিত হয়। বঙ্গবন্ধু বাজি ধরেছিলেন কবি ও গল্পকার শেখ মনির উপরে। রাজনীতিতে এসে নিত্যনতুন আইডিয়া বাস্তবায়ন করে শেখ মনি তাক লাগিয়ে দিয়েছেলেন, জিতিয়ে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুকে। 

কিন্তু দেশকে জিততে দিতে চায়নি যারা, সেই পাকিস্তানি পরাজিত শক্তির এদেশীয় দোসররা সপরিবারে হত্যা করলেন স্বপ্নদ্রষ্টাকে। সেসময় বাদ যাননি পিতার চোখের মনি হয়ে ওঠা শেখ ফজলুল হক মনিও। 

এই অতীত আমাদের জন্য যেমন করুণ তেমন অগ্নি শপথেরও। সেদিনের মরে যাওয়া স্বপ্নবৃক্ষে পরম যত্নে কচি সবুজ পাতা গঁজিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই বৃক্ষ একদিন মহীরুহ হবে। ঠিক বিশালায়তনের বাংলাদেশের মতো। যা এঁকেছিলেন বঙ্গবন্ধু। এমন স্বপ্নই দেখেন মুজিবকন্যা। আর এই বৃক্ষের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে যুবলীগের ভুমিকাও অপরিসীম। 

তাইতো শেখ ফজলুল হক মনির বড় পুত্র শেখ ফজলে শামস্ পরশের হাতে তুলে দিয়েছেন যুবলীগের দায়িত্ব। যে যুবলীগ নিয়ে চারপাশ থেকে আসছিল নানাবিধ অভিযোগ, শেখ পরশের হাত ধরে যেন হঠাৎ এক পরশপাথর ছোঁয়ায় বদলে গেলো সমস্ত দৃশ্যপট।

যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ ফজলুল হক মনির মত শেখ পরশও সাহিত্যঝোঁকা, পড়িয়েছেন একটি নামকরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর তাঁর মাথা থেকে আসা বেশ কিছু আইডিয়া করোনা মহামারিতে বেশ সাফল্যের দৃষ্টান্ত দেখিয়েছে। কারণ প্রতিটি ধারণাই ছিল নতুন।

আমি বিশ্বাস রাখি এই যুবলীগের ধারণায় একদিন বদলাবে বাংলাদেশ। আমি স্বপ্ন দেখি এই যাত্রার একজন গর্বিত অংশীদার হওয়ার। আমি এবং আমরা হয়ে উঠতে চাই শেখ ফজলুল হক মনির চোখের মনি, যেমনটা তিনি হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর।

লেখক -
ইশতিয়াক আহমেদ জয়। 
কেন্দ্রীয় সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ।